ঢাকা, লোড হচ্ছে...
সংবাদ শিরোনাম
হরিপুরে বিদ্যুৎ স্পষ্ট হয়ে একজনের মৃত্যু নেতৃত্বের গল্প শোনাতে তানজানিয়া যাচ্ছেন শ্যামনগরের অপর্ণা মল্লিক কালীগঞ্জে সৌদী বাদশাহ’র খেজুর পেল ৩০ মাদ্রাসা ও এতিমখানা ভোলা জেলা পুলিশের আয়োজনে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত পোরশা থানায় ইফতার মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠিত লাকসাম প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে ইফতার ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত নিষিদ্ধ ঘোষিত হাইড্রোজ খাদ্যে ব্যবহারে জরিমানা ও প্রতিষ্ঠান সিলগালা জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব প্রসঙ্গে গণতন্ত্রী পার্টির বিবৃতি এক ফসলা বৃষ্টিতে প্রান ফিরেছে চা বাগানে আশুলিয়ায় সাংবাদিক সমন্বয় ক্লাবের উদ্যোগে ইফতার ও দোয়া মাহফিল

ষড়যন্ত্রের অন্ধকার চিরে উদিত সূর্য তারেক রহমান

#

মেহেদি হাসান সুমন (ভোলা প্রতিনিধি)

১৬ মার্চ, ২০২৬,  3:33 AM

news image

​গল্পের শুরু ২০ নভেম্বর, ১৯৬৫ সাল ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত ও দেশপ্রেমিক পরিবারে জন্ম নিলেন এক শিশু, নাম রাখা হলো তারেক রহমান (ডাকনাম পিনু)। তাঁর জন্মের সময় বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন তৎকালীন সেনাবাহিনীর এক নির্ভীক কর্মকর্তা। শৈশব থেকেই তারেক দেখেছেন তাঁর বাবার অদম্য দেশপ্রেম আর মা বেগম খালেদা জিয়ার শান্ত কিন্তু দৃঢ় ধৈর্য। সেই ছোটবেলায় বাবার আঙুল ধরে হাঁটা আর মায়ের কোলে বসে যুদ্ধের গল্প শোনা ছিল তাঁর প্রতিদিনের সঙ্গী।

​কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে সব ওলটপালট হয়ে গেল। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বাবা জিয়াউর রহমানের রক্তভেজা নিথর দেহ যখন ঢাকায় এলো, ১৫ বছরের কিশোর তারেক তখন বাবার কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। সেই দিনই তিনি বুঝেছিলেন, তাঁর জীবন আর সাধারণ পাঁচটা ছেলের মতো হবে না। বাবার সেই বিশাল জানাজায় যখন লাখো মানুষের কান্নার রোল উঠেছিল, কিশোর তারেক তখন মনে মনে এক বিশাল দায়বদ্ধতার ভার কাঁধে নিয়েছিলেন।

নব্বইয়ের দশকে রাজনীতিতে এসে তারেক রহমান কোনো রাজকীয় বিলাসিতা বেছে নেননি। তিনি বেছে নিয়েছিলেন কাদা-মাটির পথ। 'তৃণমূল পর্যায়' থেকে দলকে গোছাতে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়িয়েছেন। কৃষকের সাথে বসে মাটির ওপর ডাল-ভাত খাওয়া আর সাধারণ মানুষের হাতে হাত রাখা ছিল তাঁর নেশা। এই প্রবল জনপ্রিয়তাই কাল হয়ে দাঁড়ালো ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে। তারা বুঝতে পেরেছিল, এই তরুণকে না থামালে তাদের মসনদ চিরস্থায়ী হবে না।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ। এক অন্ধকার রাতে তারেক রহমানকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর শুরু হয় আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য নির্যাতন। রিমান্ডের নামে এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়েছিল তাঁর মেরুদণ্ড। যন্ত্রণায় যখন তিনি বারবার জ্ঞান হারাতেন, তখনও ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁর ওপর পাশবিক অত্যাচার থামায়নি। অমানুষিক অত্যাচারে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যাতে তিনি আর কোনোদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারেন। সেই পঙ্গু শরীরের মানুষটিকে যখন হুইলচেয়ারে বসে আদালতে আনা হতো, সারা দেশের মানুষের বুক ফেটে কান্না আসত।

​এক নির্বাক আর্তনাদ ​চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে লন্ডনে নির্বাসিত হতে হয়। কিন্তু বিদেশের মাটিতে তাঁর দিনগুলো ছিল কষ্টের মহাসাগর। একদিকে নিজের পঙ্গুত্ব, অন্যদিকে দেশে মা খালেদা জিয়ার কারাবাস ও অসুস্থতা। এর মাঝেই ২০১৫ সালে আকাশ ভেঙে পড়ল তাঁর মাথায়—ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো মারা গেলেন। বিদেশের মাটিতে নির্বাসিত বড় ভাই নিজের কলিজার টুকরো ভাইয়ের লাশে শেষবারের মতো হাত ছোঁয়াতে পারেননি। হাজার মাইল দূরে ল্যাপটপের পর্দায় যখন তিনি ভাইয়ের জানাজা দেখছিলেন, তখন তাঁর সেই নিঃশব্দ কান্না আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল। এক ভাই যখন আরেক ভাইয়ের কবরে মাটি দিতে পারে না, সেই হাহাকার পৃথিবীর কোনো শব্দ দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়।

​২০১৮ সালে মা খালেদা জিয়াকে নির্জন কারাগারে পাঠানো হলো। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া মা, যিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, তাঁকে রাখা হলো এক অন্ধকার সেলে। অসুস্থতা তাঁকে গ্রাস করল, পঙ্গুত্ব গ্রাস করল তাঁকে, কিন্তু তিনি আপস করেননি। লন্ডন থেকে তারেক রহমান প্রতিদিন মায়ের জন্য অস্থির হতেন, কিন্তু দেশে ফেরার পথ ছিল রুদ্ধ। এই মা-ছেলের দীর্ঘ বছরের বিচ্ছেদ ছিল আধুনিক ইতিহাসের এক চরম নিষ্ঠুরতা। ফোনকলের ওপাশে মায়ের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনে যখন তারেক রহমান একা ঘরে কাঁদতেন, সেই খবর কেউ রাখত না।

​দীর্ঘ ১৭ বছরের অন্ধকারের পর ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব এক নতুন ভোরের ডাক দিল। স্বৈরাচারের পতন ঘটল। ২০২৫-এর ডিসেম্বরে যখন তিনি দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বাংলার মাটিতে পা রাখলেন, তখন লাখো মানুষের কণ্ঠে ছিল তাঁর নাম। কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! যে মা দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ছেলের ফেরার পথ চেয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতেন, সেই মা ছেলের এই মহাবিজয় দেখে যেতে পারলেন না। ছেলের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মা খালেদা জিয়া না ফেরার দেশে চলে গেলেন।

আজকের প্রধানমন্ত্রী ​অবশেষে এলো সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ—১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর তিনি শপথ নিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। সারা দেশের মানুষ আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠল, চারদিকে স্লোগান আর জয়ধ্বনি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সময় তারেক রহমানের চোখের কোণে ছিল লোনা জল। তিনি যখন শপথ নিচ্ছিলেন, তাঁর সামনে রাখা ছিল তাঁর মা ও বাবার ছবি।

সিংহাসনে বসার পর যখন সবাই তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছিল, তখন তাঁর মনে পড়ছিল–আজ যদি মা বেঁচে থাকতেন, তবে হয়তো নিজ হাতে ছেলের কপালে চুমু খেয়ে দোয়া করে দিতেন। আজ তাঁর সবচেয়ে বড় সুদিন, কিন্তু এই সুদিন দেখার জন্য মা নেই, বাবা নেই, ছোট ভাই কোকোও নেই।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যখন প্রথম তাঁর মা, বাবা আর ছোট ভাইয়ের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি কবরে হাত দিয়ে ডুকরে কাঁদছিলেন, আর হয়তো মনে মনে বলছিলেন—মা,আমি ফিরে এসেছি, আমি প্রধানমন্ত্রী হয়েছি, কিন্তু তোমাকে তো আর ফিরে পেলাম না।

​আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক নিঃসঙ্গ বিজয়ী। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি সফল রাষ্ট্রনায়ক, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক শোকাতুর মানুষ। তাঁর এই সিংহাসন ত্যাগের রক্তে কেনা, বিচ্ছেদের অশ্রুতে ভেজা। বাংলার ইতিহাসে এই সংগ্রাম এক অমর উপাখ্যান হয়ে থাকবে–যেখানে বিজয় আছে, কিন্তু প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার কোনো পথ নেই।