নিশাত শাহরিয়ার
১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, 2:53 AM
গলায় বাঁশি ঝোলানো এক ফুটবল সৈনিক পিয়েরলুইজি কলিনা
বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা ফুটবল। সেই ফুটবল খেলা যারা পরিচালনা করেন তাদেরকে কতটুকুইবা চিনি আমরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চেনা হয়ে উঠেনা সেই রেফারিদের। বিশ্বে বেশ কয়েকজন নামকরা রেফারি রয়েছেন যারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি দ্বারা ফুটবলকে করেছেন স্বচ্ছ। আর স্বচ্ছ ফুটবলের পূজারী আমরা সকলেই।
খেলায় স্বচ্ছতা প্রদর্শনের জন্য ১৫৮১ সালে প্রথম রেফারির ধারনা নিয়ে আসেন রিচার্ড মোলকাস্টার। আর ফুটবলারদের জন্য লাল কার্ড কিংবা হলুদ কার্ডের প্রথম ব্যবহার শুরু হয় ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে।
বলছি গলায় বাঁশি ঝোলানো ফুটবল সৈনিক পিয়েরলুইজি কলিনার কথা। রেফারিদের রেফারি হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত এক নাম পিয়েরলুইজি কলিনা। ফুটবল প্রেমীদের কাছে বেশ পরিচিত একজন তিনি। মুণ্ডিত মস্তক আর নীল চোখের এই ইতালিয়ান দীর্ঘ এক দশক আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে রেফারিং করেছেন বেশ দাপটের সঙ্গে। কঠোরতা এবং নির্ভুল রেফারিংয়ের জন্য যথেষ্ঠ খ্যাতি রয়েছে তার।
কলিনা তার রেফারিংয়ের কোর্স শেষ করেছিলেন ১৯৭৭ সালে। ইতালিয়ান সিরি ‘এ’ লীগের ৪৩টি ম্যাচ পরিচালনা করে ফিফার রেফারি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন ১৯৯৫ সালে। ছিলেন ২০০৫ সাল পর্যন্ত। বর্তমানে রেফারিং ক্যারিয়ার থেকে বিদায় নিলেও যুক্ত রয়েছেন রেফারিংয়ের সাথেই। উয়েফার রেফারি কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এছাড়াও তিনি ২০১০ সাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন ইউক্রেনের ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান হিসেবে। ফুটবল দুনিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে Evolution Soccer 3' এবং Evolution Soccer 4' ভিডিও গেমের কভার মডেলও হয়েছিলেন তিনি।
পৃথিবীর খুব কম রেফারিই পারেন গোটা মাঠজুড়ে পুরো ৯০ মিনিট সমানভাবে দৌড়ে যেতে। কিন্তু সেটা পেরেছিলেন তিনি। আত্ববিশ্বাসী এবং পরিশ্রমী কলিনাকে স্থানীয় অপেশাদার খেলায় বদ্ধ থাকতে হয়নি বেশিদিন। ক্যারিয়ারের শুরুতেই ইতালিয়ান ফুটবল লিগের তৃতীয় বিভাগের ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পান তিনি। এভাবেই শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রেফারির পথচলা। তবে কলিনার মাঠের বাইরের জীবনটা বাঁশি বাজিয়ে খেলা থামিয়ে দেওয়ার মতো এতটা সহজ ছিল না।
কলিনা আক্রান্ত হয়েছিলেন অ্যালোপেশিয়া রোগে। কলিনাকে ডাকা হত কোজাক বলে। অ্যালোপেসিয়া রোগে তার মাথায় চুল না থাকায় এ নামেই ডাকা হত বেশি। এ রোগের কারণে তার চেহারার মাঝেও আসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। তবুও দমের খেলায় দমে যাননি তিনি। মাঠের বাইরে কলিনা হয়তো কষ্ট পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু মাঠের মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর এবং পরিশ্রমী।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে কলিনার অভিষেক হয়েছিল ১৯৯৬ সালের অলিম্পিকে। ইতালিতে অনুষ্ঠিত এ টুর্নামেন্টের পাঁচ ম্যাচে রেফারিং করেছিলেন তিনি। নিজের রেফারিং ক্যারিয়ারে ১১টি ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করেন ইতালীয়ান বস কলিনা। এর মধ্যে চারটি কোপা ইটালিয়া ফাইনাল, দুটি সুপারকোপা ইটালিয়ানা ফাইনাল, আফ্রিকান ক্লাবগুলো নিয়ে হওয়া তিউনিশিয়ান কাপের ফাইনাল, ১৯৯৬ সালের অলিম্পিক ফাইনাল, ২০০৪ সালের উয়েফা কাপ ফাইনাল, ২০০২ বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং বায়ার্ন মিউনিখ ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মধ্যে হওয়া ১৯৯৯ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল।
বিশ্বকাপে কলিনার অভিষেক হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। ফ্রান্স বিশ্বকাপের গ্রুপ লিগের দুটি ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন ৩৮ বছর বয়েসী এই ইতালিয়ান। ২০০২ সালে আবারো বিশ্বকাপের মাঠে ফেরেন বিশ্ব ফুটবলের জনপ্রিয় রেফারি পিয়েরলুইজি কলিনা। এশিয়া মহাদেশে হওয়া এই টুর্নামেন্টের তিনটি ম্যাচ পরিচালনা করেন তিনি। জার্মানি এবং ব্রাজিলের এই ফাইনাল ম্যাচের রেফারিও ছিলেন ফুটবল বিশ্বের পরিচিত নাম পিয়েরলুইজি কলিনা।
ফুটবল মাঠে কলিনাকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল ২৪ আগস্ট, ২০০৫ সালে। ইংলিশ ক্লাব এভার্টন এবং স্পেনের ফুটবল ক্লাব ভিয়া রিয়ালের মধ্যকার ম্যাচের পরপরই অবসর নেন ফুটবল বিশ্বের জনপ্রিয় রেফারি পিয়েরলুইজি কলিনা।