নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ মার্চ, ২০২৬, 5:35 AM
উপস্থাপক নিশাত শাহরিয়ারকে কালো তালিকাভুক্ত করা আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা এখনো বহাল বাংলাদেশ বেতারে
আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে উপস্থাপক নিশাত শাহরিয়ারকে বাংলাদেশ বেতারের সকল কেন্দ্র এবং ইউনিট থেকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল বাংলাদেশ বেতারের অতি উৎসাহী আওয়ামী সুবিধাভোগী বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে জনস্বার্থ বিরোধী বিভিন্ন কর্মকান্ডের সমালোচনা করায় নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে সাংবাদিক ও বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান উপস্থাপক নিশাত শাহরিয়ারের উপর।
২০২১ সালের ২রা মে বাংলাদেশ বেতারের সদর দপ্তর থেকে জারী করা নথি নং ১৫.৫৩.০০০০.০০৯. ৩৬.০০৬.১৭-১৭৩২ এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ বেতারের তৎকালীন মহাপরিচালক আহম্মদ কামরুজ্জামানের অনুমোদনক্রমে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান উপস্থাপক এবং সাংবাদিক নিশাত শাহরিয়ারকে দেশের সকল বেতার কেন্দ্র এবং ইউনিটে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।
কালো তালিকাভুক্ত করার সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে জানা যায়, বেতারের অনুষ্ঠান উপস্থাপক নিশাত শাহরিয়ারকে দেশের সকল বেতার কেন্দ্রে নিষিদ্ধ করার নেপথ্যে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন বাংলাদেশ বেতারের বর্তমান ডিডিজি সায়েদ মোস্তফা কামাল।
উল্লেখ্য, তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা বেতারের বর্তমান ডিডিজি সায়েদ মোস্তফা কামাল বিসিএস ইনফরমেশন এসোসিয়েশনের নির্বাচিত মহাসচিব। এই এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে রয়েছেন বিসিএস কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম। যিনি দীর্ঘ সময় ধরে সচিব পদমর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্পিচ রাইটার ছিলেন। কথিত আছে, শেখ হাসিনার স্পিচ রাইটার নজরুল ইসলামের সাথে গভীর সখ্যতা থাকায় বেতারে একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদর্শন করতেন ফ্যাসিস্ট পরিবারের আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তা সায়েদ মোস্তফা কামাল।
বাংলাদেশ বেতারের মতো একটি সরকারি প্রচার মাধ্যমে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নিশাত শাহরিয়ার জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের সমালোচনা করায় তাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসের স্ক্রীনশর্ট নিয়ে প্রতিটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে বিশেষ মন্তব্য করাসহ কালো তালিকাভুক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহনের নথিতে স্বাক্ষর করেছিলেন পারিবারিকভাবে আওয়ামী পরিবারে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশ বেতারের বর্তমান উর্দ্ধতন কর্মকর্তা সায়েদ মোস্তফা কামাল।
আওয়ামী ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তার দল এবং তৎকালীন ফ্যাসীবাদী আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে কোন প্রকার সমালোচনা মেনে নিতে পারতেন না বলে সায়েদ মোস্তফা কামাল নিজ উদ্যোগে তার (নিশাত শাহরিয়ার) বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন বেতারের সাবেক মহাপরিচালক আহম্মদ কামারূজ্জামান। বেতারে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহনসহ সকল সিদ্ধান্ত গ্রহনে সায়েদ মোস্তফা কামালের একক আধিপত্য থাকায় মহাপরিচালক হিসেবে সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া এবং আদেশে স্বাক্ষর করা ছাড়া কোন উপায় থাকে না। মহাপরিচালক হিসেবে এভাবে ক্ষমতাহীন করে রাখাটা ছিল বেশ বিব্রতকর বলেও আক্ষেপ করেন আহম্মদ কামারুজ্জামান। ২০২২ সালের ২৩ জুলাই মারা যাবার কিছুদিন আগে এ বিষয়ে এভাবেই তিনি তার অসহায়ত্বের কথা বলেছিলেন বলে জানান বাংলাদেশ বেতারের উপস্থাপক নিশাত শাহরিয়ার।
সায়েদ মোস্তফা কামালের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ তৎকালীন সময়ের সংগীত বিভাগের পরিচালক মো: আরিফুল ইসলামের সাথে তাকে যোগাযোগের পরামর্শ দেয়া হয়েছিল বলে জানান নিশাত শাহরিয়ার।মহাপরিচালক হিসেবে কতটা অসহায় হলে তিনি তার অধীনস্থ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দিতে পারেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পরবর্তীতে সংগীত বিভাগের পরিচালক আরিফুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করার পর নিশাত বলেন, এ বিষয়ে জানতে চেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে সরাসরি ডিজিএফআইয়ের কাছে আপনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী অভিযোগ করা হবে বলে হুমকি দেন বাংলাদেশ বেতারের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের বর্তমান পরিচালক মোঃ আরিফুল ইসলাম। গণমাধ্যমকে এভাবেই হয়রানির কথা জানান বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান উপস্থাপক নিশাত শাহরিয়ার।
তিনি আরো বলেন, বেতারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মো: আরিফুল ইসলাম বর্তমানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাংলাদেশ বেতারের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবং তার সেকশনে চিহ্নিত আওয়ামী লীগ ও দোসরদের কৌশলে সুযোগ করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক নিশাত শাহরিয়ার।
এদিকে, বাংলাদেশ বেতারে কর্মরত বেশ কয়েকজন অনুষ্ঠান উপস্থাপক-উপস্থাপিকা নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, আওয়ামী শাসনামলে বেশ কয়েকবার প্রমোশন পাওয়া ফ্যাসিস্ট সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা সায়েদ মোস্তফা কামালের গ্রামের বাড়ী পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার সাকোয়া ইউনিয়নে। সাকোয়া গ্রামের সাকোয়া বাজারের পাশেই বাড়ী আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ এই পরিবারটির। তার বাবা মো: মোখলেছুর রহমান পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময়। বেতারের বর্তমান ডিডিজি সায়েদ মোস্তফা কামালের মা নুর জাহান বেগম পঞ্চগড় জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তার ভাই সায়েদ জাহাঙ্গীর হাসান সবুজ সাঁকোয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।
আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ২০১১ এবং ২০২১ সালে দুইবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। সায়েদ মোস্তফা কামালের আরেক ভাই সায়েদ মনজুরুল হাসান সুজা বোদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করেছে এই পরিবার এবং এই পরিবারের প্রতিটি সদস্য। পরিবারের প্রতিটি সদস্য অত্যন্ত চতুর হওয়ায় তাদের নামে বেনামে রয়েছে অসংখ্য সম্পদ। ফ্যাসিবাদী সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে এই পরিবারের প্রতিটি সদস্যদের দ্বারা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হয়েছে সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা।
আর তাই স্বৈরাচারী হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট ফ্যাসিবাদী সরকারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এই পরিবারটির বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। তবে এত কিছুর পরও এখনো বাংলাদেশ বেতারে আওয়ামী ফ্যাসিস্টরা কিভাবে বহাল থাকে এমন প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে।