তিমির বনিক (মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি)
২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫, 10:58 AM
পরিযায়ী পাখির আগমনে অপরুপ সৌন্দর্য্যৈ বাইক্কা বিল
নদী দখল ও দূষণের কবলে ‘নদীমাতৃক’ শব্দটি কিছুটা ভাটা পড়ে গেলেও প্রাকৃতিক হাওরবিল এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি দেশের প্রকৃতি থেকে। বাংলাদেশের সৌন্দর্য্য ঘেরা প্রকৃতি গুলোই দেশের জীবন্ত প্রাণ।
জলাভূমির অন্তঃপুর থেকে আপনাআপনি গজিয়ে উঠা তৃণ জলচর পাখিদের যোগান দেয় খাদ্যনির্ভরতার বার্তা বয়ে বেড়ায়। ভাসমান ফেনার আড়ালে দেহমুখ লুকিয়ে তারা কাটিয়ে দেয় একেকটি দিন আর রাত।
বেগুনি কালেম, পানকৌড়ি সহ অগণিত আবাসিক পাখিদের শীতের ছোঁয়ার নিমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নিমন্ত্রণ রক্ষায় এই বাইক্কা বিলে ছুটে আসে পরিযায়ী পাখিদের দল। নানান প্রজাতির পরিযায়ী পাখিরা বিভিন্ন প্রজাতির অবাসিক পাখিদের সাথে মিলেমিশে এখানেই রচনা করে এক 'স্বর্গরাজ্য'। আর এটাই এই বিলের প্রকৃতিক বিস্ময় করা প্রতিচ্ছবি!
বুধবার (২৪শে ডিসেম্বর) তখন শীতের স্নিগ্ধ মিষ্টি সকাল পেরিয়ে দুপুর। রোদের তীব্রতার ভেতর দিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে স্বচ্ছ জলাধার ‘বাইক্কা বিল’। অপরাহ্নের এরূপ রৌদ্রময় উত্তাপে সবকিছুই যেন এক নতুন সৌন্দর্যের মোড়কে মেলে ধরার চিরাচরিত নিয়মে পরিণত। এটি মৌলভীবাজারের একমাত্র 'মৎস্য অভয়ারণ্য'। অপরূপ সৌন্দর্য্য ভরা এই বিলটিতে রয়েছে প্রাকৃতিক জলাভূমির বিস্ময়কর উপকারিতা। যা দিনের পর দিন মৎস্য সম্পদকে নিবিড়ভাবে সমৃদ্ধ করে চলেছে নিরবে।
বাইক্কা বিলে রয়েছে জলচর পাখির কিচিরমিচির শব্দ, ঝাঁকে ঝাঁকে বেঁধে ওড়ে বেড়ানো পরিযায়ী পাখিদের ঝাঁক, বিলের পানিতে জলচর পাখিতে ঝাঁপাঝাঁপি-এ যেন চির সৌন্দর্য্যের অদেখা আরেকটি ভিন্ন রূপ। ইতোমধ্যে এই বাইক্কা বিলে আসতে শুরু করেছে এতেই মেলায় পরিণত হবে পরিযায়ী পাখির।
হাইল হাওরের পূর্ব দিকের প্রায় ১৭০ হেক্টর আয়তনের একটি সমৃদ্ধ জলাভূমি নিয়ে বাইক্কা বিলের অবস্থান। ২০০৩ সালে সরকার হাইল হাওরকে মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে পর্যটকদের কাছে বাড়তে থাকে এর পরিচিতি আর সৌন্দর্য্যের রূপ।
এই বাইক্কা বিলে শীত মৌসুমে প্রায় ১৭৫ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। বিলের মূল আকর্ষণ পরিযায়ী আর স্থানীয় পাখি হলেও এই বিল-কে মাছের রাজ্যও বলা হয়। দেশের প্রকৃতিতে বাইক্কা বিল ঋতুভেদে একেক সময় একের রূপে ধারণ করে নিজেকে উপস্থাপন করে। বিলের পাখিদের গতিবিধি আর বিলের অপার সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য সেখানে তৈরি হয়েছে একটি সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার।
শঙ্খচিল, ভূবনচিল, দলপিপি, নেউপিপি, পাতি সরালি হাঁস, বালি হাঁস, মরচেরং ভূতি হাঁস, পানকৌড়ি, গো-বক, ধলাবক, বেগুনি কালেম প্রকৃতিতে পাখিদের কলকাকলিতে মুখর বাইক্কা বিলের জলজ জীববৈচিত্র্য।
চাপড়া, মাগুড়া ও যাদুরিয়া বিলের নামে ২০০৩ সালে বাইক্কাবিল স্থায়ীভাবে মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়। অভয়াশ্রমটির জীববৈচিত্র্য ফিরে পাওয়া ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য শুরু থেকে সরকার বড়গাংগিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করে। ধীরে ধীরে এ বিলে বিপন্ন বা হারিয়ে যাওয়া মাছেদের প্রজনন রক্ষার ব্যাপারটি ঘটে গেছে। এর পাশাপাশি আবাসিক ও পরিযায়ী পাখিদের একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বাইক্কা বিল আজ দেশজুড়ে সুপরিচিত স্থান।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন বলেন, বাইক্কা বিল স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম। মৎস্য অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় ২০০৩ সাল থেকে এটি চালু আছে। আসলে আপনারা অনেকেই জানেন বাইক্কা বিল হাইল হাওরের একটি বিল এবং পুরো বিলটি স্থায়ী অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। এখানে অতোপ্রতভাবে জড়িত আছে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, বন বিভাগ সবাই মিলে আসলে আমরা এখানে কাজ করছি। কারো একার পক্ষে এতো বড় একটি জলাভূমি সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, যেহেতু পুরো বিলটি লীজ হয় না কখনোই, যার ফলে এখানে মাছের পাশাপাশি সমস্ত রেপটাইলস (সরীসৃপ প্রাণী), স্তণ্যপায়ী প্রাণী, এম্ফিবিয়ান (উভচর প্রাণী) সব প্রাণীরই একটি সুন্দর ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে এবং এখানের ইকোসিস্টেমর হেল্থটা (খাদ্যশৃংখলের স্বাস্থ্য) বাংলাদেশের যে কোনো জলাভূমির চেয়ে অনেক অনেক ভালো (অধিকতর ভালো)। এই কারণেই এটি দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে একটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিণত হয়েছে। তবে একসময় পর্যটকরা এখানে আসতো, কিন্তু মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ উপদেষ্টার একটি ঘোষণা অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারি থেকে কোনো দর্শনার্থীদের আমরা প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছি না পুরোপুরি ভাবে।