মেহেদি হাসান সুমন (ভোলা প্রতিনিধি)
২৩ মে, ২০২৬, 10:15 PM
ভোলায় আমির হোসেনের রূপালী বিপ্লব
এক সময় ভোলার বাজারে মাছ আসতো দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে। আর এখন সেই ভোলা থেকেই দেশের নানা প্রান্তে যাচ্ছে মাছ, ডিম ও রেনুপোনা। বদলে যাচ্ছে জেলার অর্থনীতি, তৈরি হচ্ছে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান।
আর এই নীরব বিপ্লবের পেছনে রয়েছেন ভোলার এক সাধারণ মানুষ আলহাজ্ব আমির হোসেন খান। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময়ের নিরলস প্রচেষ্টায় তিনি আজ কেবল একজন সফল চাষিই নন বরং জেলাজুড়ে এক অনুকরণীয় উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের এই উদ্যোক্তা দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পরিশ্রম আর পরিকল্পনার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন ‘রূপালী মৎস্য খামার ও হ্যাচারি’।
সদর উপজেলার ভেলুমিয়া, উত্তর দিঘলদী ও দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বর্তমানে তার রয়েছে ৭০টিরও বেশি পুকুর ও ৩টি আধুনিক হ্যাচারি। প্রায় ১২০ একর জমির এই প্রকল্প এখন জেলার অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খামারের অধিকাংশ পুকুরই নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। জোয়ার-ভাটার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ থাকায় এখানকার মাছের স্বাদ অন্যসব চাষের মাছের তুলনায় আলাদা। রুই, কাতলা, পাঙ্গাস ও তেলাপিয়ার চাহিদা তাই অনেক বেশি। পাইকাররা আগাম দাদন দিয়ে মাছ সংগ্রহ করছেন। এখানকার মাছ এখন ভোলা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
শুধু মাছই নয় এই খামারের তিনটি হ্যাচারিতে উৎপাদিত মাছের ডিম ও রেনুপোনাও যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এক সময় যেখানে ভোলার চাষিদের বাইরে থেকে রেনুপোনা আনতে হতো এখন সেই ভোলা থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় রেনুপোনা পাঠানো হচ্ছে। এতে যেমন জেলার সুনাম বাড়ছে, তেমনি শক্তিশালী হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি।
খামার সূত্রে জানা যায়, প্রতি কেজি মাছের ডিম ফুটাতে খরচ হয় প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা। সেই ডিম বাজারে বিক্রি হয় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার, কখনও ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়া হ্যাচারিতে উৎপাদিত রেনুপোনা আকারভেদে ৪০ পয়সা থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। একদিন বয়সী রেনুপোনা বিক্রি হয় ৪০ পয়সায় আর এক মাস বয়সী রেনুপোনা বিক্রি হয় ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত। প্রতিটি রেনুপোনায় ১০ থেকে ২০ পয়সা পর্যন্ত লাভ থাকে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাত্র ২৫০ গ্রাম ওজনের প্রতি প্যাকেটে থাকে কয়েক হাজার মাছের রেনুপোনা। প্যাকেটের ভেতরে বিশেষভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করে সংরক্ষণ করা হয় রেনুপোনাগুলো যাতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও জীবিত অবস্থায় দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছানো যায়।
অন্যদিকে, পুকুরে চাষ করা পাঙ্গাস মাছ মাত্র ১৪ মাসেই বিক্রিযোগ্য হয়ে ওঠে। প্রতিটি মাছের ওজন হয় আড়াই থেকে তিন কেজি পর্যন্ত। এসব মাছ মনপ্রতি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়।
একইভাবে বড় আকৃতির তেলাপিয়া মাছ মনপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারদর ওঠানামা করলেও প্রতিবছর খরচ বাদ দিয়ে মোটা অঙ্কের মুনাফা অর্জন করছেন উদ্যোক্তা আমির হোসেন খান।
সবচেয়ে বড় বিষয়, এই প্রকল্পকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থান। এক সময় যারা কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতেন তাদের অনেকেই এখন এই খামারে কাজ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। কেউ পুকুর পরিচর্যা করছেন, কেউ মাছ আহরণে কাজ করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত হ্যাচারির বিভিন্ন কার্যক্রমে। এতে করে এলাকার তরুণদের মধ্যে বাড়ছে মৎস্য খামার গড়ে তোলার আগ্রহও।
বোরহানউদ্দিন ও চরফ্যাশন থেকে রেনুপোনা কিনতে আসা ব্যবসায়ী জসিম ও হুমায়ূন কবির জানান, ভোলার এই খামারের মাছ ও রেনুপোনার মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
মৎস্য খাতে বিশেষ অবদানের জন্য একাধিকবার সম্মাননাও পেয়েছেন উদ্যোক্তা আমির হোসেন খান।
তিনি বলেন, সরকারি সহযোগিতা ও সহজ শর্তে খাস জমি পেলে খামারের পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের মৎস্য খাতে আরও বড় অবদান রাখা যাবে।
স্থানীয়দের মতে, ভোলার এই মৎস্য খাত এখন শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি জেলার অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনার নতুন পরিচয় হয়ে উঠেছে। ভোলার এই ‘রূপালী বিপ্লব’ এখন দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের কাছেও অনুপ্রেরণার গল্প।