হাসান আলী সোহেল (নাটোর জেলা প্রতিনিধি)
১৫ এপ্রিল, ২০২৬, 6:38 PM
গুলি ও মাইকিং করে চাঁদা দাবি কালু বাহিনীর, ডিগ্রীর চরে সন্ত্রাসের রাজত্ব
পহেলা বৈশাখের প্রথম দিনেই আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষিকুন্ডার ডিগ্রীর চর ও চরকুরুলিয়া বাজারে। সন্ত্রাসী সংগঠন কালু বাহিনী প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে ও হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীর কাছে চাঁদা দাবি করেছে।
একই সঙ্গে ডিগ্রীর চরে কাউকে জমি ইজারা নিতে নিষেধ করা হয়েছে এবং বাহিনীর সদস্যদের দোকান থেকে পণ্য নিলে তা থেকে টাকা না চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল সকালের দিকে কালু বাহিনীর সদস্য ইসলাম, রকিব কামার, রাজুসহ কয়েকজন সশস্ত্র সদস্য চরকুরুলিয়া বাজারে উপস্থিত হয়। তারা প্রথমে কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত করে।
পরে একটি হ্যান্ডমাইক নিয়ে তারা ঘোষণা দেয়, “ডিগ্রীর চরে কেউ যেন আমাদের চাঁদা না দিয়ে জমি ইজারা না নেয়। আর আমাদের কেউ যদি তোমাদের দোকান থেকে কিছু নেয়, তাহলে সেটার টাকা কখনো চাইবে না।”
বাহিনীর সদস্য রকিব কামার আরও বলেন, “আমাদের কালু বাহিনীর কোনো লোককে কেউ কিছু বললে তার পরিবার ও বংশ নির্বংশ করে দেব।” তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই তাদের প্রধান কালু ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছেন। কালু আসার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—কে চরে থাকতে পারবে এবং কীভাবে চাঁদা আদায়ের কাঠামো দাঁড় করানো হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী এক কৃষক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রকিব কামারের বাড়ি ওই এলাকাতেই। আগস্টের আগে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি ডিগ্রী চরে গিয়ে কালু বাহিনীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। তার এই দলবদল এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, রকিব কামার বর্তমানে চরকুরুলিয়া, চর আলহাজ্ব ও আশপাশের এলাকার সাধারণ কৃষক ও শিশুদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা আদায় করছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত বছর কালু বাহিনী ডিগ্রীর চরে প্রায় ১৫ শো বিঘা জমি নিজেদের আয়ত্তে নিয়ে সেখানে একটি বিশাল আস্তানা গড়ে তোলে। পরে যৌথবাহিনী ওই আস্তানা ভেঙে দিলেও কালু বাহিনী পুনরায় সেখানে তাদের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে।
বর্তমানে ওই আস্তানাটি আরও সুসংহত ও সুরক্ষিত করে তোলা হয়েছে। বাহিনীর সদস্যরা প্রতিটি কৃষকের কাছ থেকে ‘নিরাপত্তা কর’ নামে চাঁদা আদায় করছে। গত বছর কালু বাহিনীর গুলির আঘাতে বেশ কয়েকজন কৃষক পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। একজন কৃষক বলেন, “আমরা জীবন-মরণের মধ্যে তিনবার পড়েছি। এবার কী হবে কে জানে?”
গত ৩০ মার্চ ডিগ্রীর চর আবারও ইজারা দেওয়া হয়েছে। এবার ইজারা নিয়েছেন ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া আসনের সংসদ সদস্য আবু তালেব মন্ডলের ভাতিজা মামুন মন্ডল ও বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা জাকারিয়া পিন্টুর ছোট ভাই সেও বহিষ্কৃত স্বেচ্ছাসেবক দলের মেহেদী হাসান।
সন্ত্রাসের এই ঘটনায় এলাকাবাসী চরম আতঙ্কে দিনযাপন করছেন। একাধিক কৃষক ও ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কালু বাহিনীর লোকেরা দিনের বেলায়ও বাজারে আসে, গুলি চালায়। আমরা পুলিশের হস্তক্ষেপ চাই।” অনেকে আবার আশঙ্কা করছেন, কালু বাহিনীর প্রধান ভারত থেকে ফিরলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
আপাতত ডিগ্রীর চর ও আশপাশের এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো বড় পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসী দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় হস্তক্ষেপ ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন।