ঢাকা, লোড হচ্ছে...
সংবাদ শিরোনাম
রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে আটক ৪ মাদক ব্যবসায়ী চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট, স্কাপ সিরাপসহ ভারতীয় মদ জব্দ বড়লেখায় মন্দির গুড়িয়ে দেওয়ার হুমকির প্রতিবাদে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কুলাউড়ায় ইউপি সদস্য লোকমান গ্রেপ্তার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে খালের জায়গা দখলকারী আলমাসের খুঁটির জোর কোথায় ঘাটাইলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীর এক বছরের কারাদণ্ড পোরশায় মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত খুলনায় হত্যাসহ ২২ মামলার আসামি ইমরান হাওলাদার গ্রেফতার নবাবগঞ্জ উপজেলায় গ্রাম আদালত কর্মশালা অনুষ্ঠিত শ্রীপুরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা, গাছ লাগিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন বাচ্চু মিয়ার

ঘ্রাণের মাধ্যমে সুস্থতা: বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্ত

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

০২ জুন, ২০২৬,  10:43 PM

news image

মানুষের জীবনে ঘ্রাণের প্রভাব কতটা গভীর তা আমরা অনেক সময় উপলব্ধিই করি না। একটি পরিচিত ফুলের সুবাস, ভেজা মাটির গন্ধ কিংবা তাজা পাতার ঘ্রাণ মুহূর্তেই আমাদের মনকে অন্য এক জগতে নিয়ে যেতে পারে। কখনও তা শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে, কখনও বা মানসিক ক্লান্তি দূর করে প্রশান্তির অনুভূতি জাগায়।

এই ঘ্রাণের শক্তিকেই কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে এরোমা থেরাপি (Aromatherapy)—একটি প্রাকৃতিক ও সমন্বিত স্বাস্থ্যচর্চা পদ্ধতি, যা আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। শুধু শারীরিক আরাম নয়, মানসিক প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিক মনোসংযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে।

এরোমা থেরাপির মূল ভিত্তি হলো বিভিন্ন ফুল, পাতা, ফল, বীজ ও উদ্ভিদ থেকে আহরিত এসেনশিয়াল অয়েল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ এসব সুগন্ধি উদ্ভিদ ব্যবহার করে আসছে। আধুনিক যুগে গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে এই প্রাকৃতিক নির্যাসগুলোকে আরও সুসংগঠিতভাবে স্বাস্থ্যচর্চার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্বের বহু উন্নত দেশে এরোমা থেরাপি কেবল স্পা বা সৌন্দর্যচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি হোলিস্টিক থেরাপি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, যেখানে দেহ, মন ও আত্মার সামগ্রিক সুস্থতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ল্যাভেন্ডার, ইউক্যালিপটাস, রোজমেরি ও পিপারমিন্টের মতো এসেনশিয়াল অয়েল বিভিন্ন ওয়েলনেস কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অনেক ব্যবহারকারী ও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে এসব সুগন্ধ শারীরিক প্রশান্তি বাড়াতে, ঘুমের মান উন্নত করতে এবং দৈনন্দিন ক্লান্তি কমাতে সহায়ক হতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন হাসপাতাল, পুনর্বাসন কেন্দ্র ও পরিচর্যা প্রতিষ্ঠানে রোগীদের আরামদায়ক পরিবেশ তৈরির জন্যও এরোমা থেরাপির ব্যবহার দেখা যায়। যদিও এটি প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প নয়, তবুও অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মানুষের ঘ্রাণেন্দ্রিয় সরাসরি মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যা আবেগ, স্মৃতি ও অনুভূতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই একটি সুগন্ধ আমাদের মনোভাব পরিবর্তন করতে পারে কিংবা নির্দিষ্ট স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে পারে।

ল্যাভেন্ডার, গোলাপ, বারগামট ও লেবুভিত্তিক সুগন্ধ অনেকের কাছে মানসিক প্রশান্তি অর্জনের উপায় হিসেবে জনপ্রিয়। বর্তমানে বিশ্বের বহু কর্পোরেট অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মেডিটেশন সেন্টার ও থেরাপি ক্লিনিকে পরিবেশকে আরও স্বস্তিদায়ক করতে ডিফিউজারের মাধ্যমে সুগন্ধ ব্যবহার করা হচ্ছে।

মানুষের আধ্যাত্মিক অনুশীলনের ইতিহাসেও সুগন্ধের ব্যবহার নতুন নয়। বিভিন্ন সভ্যতায় ধ্যান, প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সুগন্ধি কাঠ, ফুল ও রজন ব্যবহার করা হয়েছে।

বর্তমান সময়ে স্যান্ডালউড, ফ্র্যাঙ্কিনসেন্স, লোটাস ও প্যাচুলির মতো সুগন্ধ ধ্যানচর্চার সময় ব্যবহৃত হয়। অনেকের মতে, এসব সুগন্ধ মনকে স্থির করতে, মনোসংযোগ বাড়াতে এবং অন্তর্মুখী চিন্তার পরিবেশ তৈরি করতে সহায়তা করে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন যোগ ও মেডিটেশন কেন্দ্রে এর ব্যবহার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশে এরোমা থেরাপি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং ভেষজ উদ্ভিদের বৈচিত্র্য এই খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।

বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এরোমা থেরাপি এবং ন্যাচারাল ওয়েলনেস বিষয়ে পরিচিতিমূলক ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি মেডিকেল, মিউজিক থেরাপি ও সাউন্ড থেরাপি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এটিকে সহায়ক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

গ্রামীণ পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও এনজিও সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি করবে।

বাংলাদেশে উৎপাদিত গোলাপ, তুলসি, লেমনগ্রাস, লেবু, বেলপাতা ও অন্যান্য সুগন্ধি উদ্ভিদ থেকে এসেনশিয়াল অয়েল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে এই খাতে নতুন শিল্প ও ব্র্যান্ড গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয়ের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করতে পারে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এরোমা ওয়েলনেস সেন্টার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের সেবা প্রদানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য, প্রসূতি-পরবর্তী মানসিক চাপ, মাদক পুনর্বাসন কার্যক্রম, শিশু-কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাগ্রতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচিতে এ ধরনের কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে।

মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মনোবিজ্ঞান বিভাগ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ যৌথভাবে এর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করতে পারে। বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক গবেষণা বৃদ্ধি পেলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।

সরকারি পর্যায়ে বিকল্প ও পরিপূরক স্বাস্থ্যচর্চা বিষয়ক নীতিমালার আওতায় এরোমা থেরাপি নিয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী উন্নয়ন প্রকল্প ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান কর্মসূচির সঙ্গে এই খাতকে যুক্ত করা সম্ভব। 

একবিংশ শতাব্দীর দ্রুতগতির জীবন মানুষকে যেমন প্রযুক্তিনির্ভর করেছে,তেমনি বাড়িয়েছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও ক্লান্তি। ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষ আবারও প্রকৃতির দিকে ফিরে তাকাতে শুরু করেছে।

এরোমা থেরাপি সেই প্রত্যাবর্তনেরই একটি প্রতীক। এটি শুধু সুগন্ধ উপভোগের বিষয় নয়; বরং প্রকৃতি, মন এবং মানবজীবনের মধ্যে এক নতুন সংযোগ তৈরির প্রচেষ্টা। প্রয়োজনীয় গবেষণা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশেও এই ক্ষেত্রটি বিকশিত হতে পারে।

সরকার, গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগে একদিন হয়তো “ঘ্রাণের মাধ্যমে সুস্থতা” বাংলাদেশের বিকল্প স্বাস্থ্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হবে।

মো: শোয়েব হোসেন

থেরাপি গবেষক ও সংগীত শিক্ষক